ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রতিবেদন

বহুপক্ষীয় সহযোগিতা সংস্থাগুলো দুর্বল হচ্ছে, বাড়ছে ছোট ছোট স্বার্থভিত্তিক জোট

ভূরাজনৈতিক ও সুরক্ষাবাদী নীতির প্রভাবে বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে বৈশ্বিক অর্থনীতি।

ভূরাজনৈতিক ও সুরক্ষাবাদী নীতির প্রভাবে বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে বৈশ্বিক অর্থনীতি। এর প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক সহযোগিতার পুরনো কাঠামোয়ও। বহুপক্ষীয় সংস্থাগুলো ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে। এমন পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা পুরোপুরি থেমে না গিয়ে নতুন রূপান্তরের দিকে যাচ্ছে। ছোট ও স্বার্থভিত্তিক জোট বাড়ছে। পরিবর্তিত এ বাস্তবতায় বাণিজ্য, বিনিয়োগ, নিরাপত্তা ও উন্নয়ন নীতিতে তৈরি হচ্ছে নতুন সমীকরণ। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) ‘গ্লোবাল কো-অপারেশন ব্যারোমিটার’ প্রতিবেদনে এমন বক্তব্য উঠে এসেছে। খবর ইউরো নিউজ।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্রমেই বৈশ্বিক সংঘাত ও অবিশ্বাসের কাছে পিছিয়ে পড়ছে জাতিসংঘকেন্দ্রিক আনুষ্ঠানিক উদ্যোগগুলো। এর বদলে আলাদা বৈশ্বিক কাঠামো গড়ে উঠছে, যেখানে গুরুত্বপূর্ণ কিছু ক্ষেত্রে নতুন ধারার বৈশ্বিক সহযোগিতা এখনো ফল দিচ্ছে।

জেনেভাভিত্তিক সংস্থটির মতে, পুরনো সহযোগিতা কাঠামো প্রতিকূলতার মুখে পড়লেও বাণিজ্য, পুঁজি, প্রযুক্তি, জলবায়ু, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা এসব ক্ষেত্রে বৈশ্বিক সহযোগিতা প্রত্যাশার তুলনায় বেশি টেকসই প্রমাণিত হচ্ছে। সামগ্রিকভাবে সহযোগিতা কার্যক্রম স্থিতিশীল থাকলেও তা এখন ছোট ছোট মিত্রগোষ্ঠীর মধ্যেই বেশি ঘটছে।

প্রথাগত বহুপক্ষীয় সহযোগিতা দুর্বল হলেও বিকল্প জোট ও জোটভিত্তিক উদ্যোগ সে ঘাটতি অনেকাংশে পূরণ করছে। এসব উদ্যোগ সাধারণত সুনির্দিষ্ট স্বার্থভিত্তিক হয়ে থাকে, ফলে রাজনৈতিকভাবে টিকিয়ে রাখা তুলনামূলক সহজ।

সাম্প্রতিক প্রবণতা বিশ্লেষণের ভিত্তিতে ডব্লিউইএফের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈশ্বিক বাণিজ্যে পণ্যপ্রবাহ পুনর্বিন্যস্ত হচ্ছে। এতে তুলনামূলকভাবে বেশি ভূমিকা রাখছে ভূরাজনৈতিক নিরাপত্তা ও কৌশলগত জোট। তবু সরবরাহ চেইন ও বাজার বৈচিত্র্যায়ণের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে যেসব অংশীদার বেশি নির্ভরযোগ্য তাদের দিকে ঝুঁকছে দেশগুলো।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৭-২৪ সালের মধ্যে বৈশ্বিক পণ্য বাণিজ্যে গড় ভূরাজনৈতিক দূরত্ব প্রায় ৭ শতাংশ কমেছে। পণ্য কেনাবেচা কাছের ও রাজনৈতিকভাবে ঘনিষ্ঠ দেশগুলোর মধ্যেই সীমিত হয়ে এসেছে। এতে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, বৈশ্বিক বাণিজ্য সমমনা নেটওয়ার্কের ভেতরে পুনর্বণ্টিত হচ্ছে, একই সঙ্গে অংশীদারদের মধ্যে বৈচিত্র্যও বাড়ছে।

এ পুনর্বণ্টন প্রক্রিয়ায় লাভবান হচ্ছে উৎপাদননির্ভর উদীয়মান রফতানিকারক দেশগুলো। ২০২৪ সালে বৈশ্বিক রফতানিতে উন্নয়নশীল অর্থনীতি ও চীনের হিস্যা বেড়েছে। এমন একসময়ে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, যখন উন্নত অর্থনীতিগুলো কৌশলগত খাতে বাণিজ্য নীতিকে আরো কঠোর করছে।

২০২৪ সালে উন্নয়নশীল অর্থনীতি ও চীনের রফতানি বেড়েছে ২৭ হাজার ৬০০ কোটি ডলার, অর্থাৎ আগের বছরের তুলনায় ৫ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি। এতে অর্ধেকেরও বেশি হিস্যা চীনের। ২০২৫ সালে মার্কিন শুল্কনীতির প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। তবে প্রাথমিক ইঙ্গিত বলছে, এটি বাণিজ্য সংকোচনের বদলে পুনর্গঠনকে গতিশীল করেছে। গত বছর বৈশ্বিক বাণিজ্য আনুমানিক ২ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে।

ডব্লিউইএফের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, পণ্য বাণিজ্যের পুনর্বিন্যাসের ধারায় পুঁজি ও সেবাপ্রবাহ বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে সংবেদনশীল শিল্পে প্রযুক্তিগত দক্ষতা নিশ্চিত এবং ঘরোয়া সক্ষমতা গড়ে তুলতে সক্রিয় ভূমিকা নিচ্ছে সরকার। ফলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিও বদলে গেছে। দক্ষতানির্ভর বিশ্বায়ন থেকে সরে গিয়ে স্থিতিশীলতানির্ভর বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকছে দেশগুলো।

ব্যারোমিটার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক বিনিয়োগ ক্রমেই কৌশলগতভাবে সংবেদনশীল বা ভবিষ্যৎ নির্ধারণকারী খাতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) অবকাঠামো, ব্যাটারি ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ খাত।

পুঁজি ও সেবাপ্রবাহ বাড়লেও অফিশিয়াল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসিস্ট্যান্সের (ওডিএ) মতো প্রথাগত বহুপক্ষীয় সহযোগিতা কমছে। কারণ অনেক দেশে রাজনীতি কঠোর হয়ে গেছে ও অর্থনৈতিক চাপ বেড়েছে। ফলে দাতা দেশগুলো কম সহায়তা দিচ্ছে বা স্থানীয় অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বাজেট পুনর্বিন্যাস করছে। আগের বছরের তুলনায় ২০২৪ সালে ওডিএ কমেছে ১০ দশমিক ৮ শতাংশ। মাত্র চারটি উন্নত দেশ জাতিসংঘ নির্ধারিত মোট জাতীয় আয়ের (জিএনআই) দশমিক ৭ শতাংশ উন্নয়ন সহায়তায় ব্যয়ের লক্ষ্য অতিক্রম করেছে। অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ওইসিডি) পূর্বাভাস অনুসারে, ২০২৫ সালে ওডিএ কমবে ৯-১৭ শতাংশ।

অভিবাসন প্রসঙ্গে ডব্লিউইএফ বলছে, ২০২৪ সালে অভিবাসনের গতি কমার আভাস পাওয়া গেছে। ২০২৫ সালে বড় গন্তব্য দেশগুলো আরো কড়াকড়ি আরোপ করায় সংকোচন তীব্র হয়েছে। গত বছর যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানিতে নিট অভিবাসন প্রবাহ যথাক্রমে আনুমানিক ৬৫ ও ৩৯ শতাংশ কমেছে।

প্রতিবেদনে বহুপক্ষীয় শান্তি ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি সম্পর্কে বলা হয়, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের (ইউএনএসসি) প্রস্তাবের সংখ্যা ২০২৩ সালের ৫০টি থেকে ২০২৪ সালে নেমে এসেছে ৪৬টিতে। সংঘাতের তুলনায় বহুপক্ষীয় শান্তি মিশনের অনুপাত কমেছে প্রায় ১১ শতাংশ। জাতিসংঘের হস্তক্ষেপকে আরো কঠিন করে তুলছে ভূরাজনীতি। ভেটো ক্ষমতার পাশাপাশি শান্তিরক্ষা মিশনকে চাপে ফেলছে বাজেট ও জনবল সংকট।

২০১৪ সালের পর থেকে ইউএনএসসি নতুন কোনো শান্তিরক্ষা মিশনের অনুমোদন দেয়নি। বাজেট কাটছাঁটের ফলে বিদ্যমান মিশনগুলোও চাপের মুখে। ২০১৫-২৪ সালের মধ্যে মিশনে নিয়োজিত জনবল ৪০ শতাংশের বেশি কমেছে। জাতিসংঘ এখন বড় সামরিক মোতায়েন থেকে সরে গিয়ে কূটনৈতিক উদ্যোগ, বিশেষ রাজনৈতিক মিশন ও আঞ্চলিক কাঠামোর দিকে ঝুঁকছে।

বৈশ্বিক এ অস্থিরতা এখন সরাসরি ব্যবসার পরিবেশে প্রভাব ফেলছে। জরিপে অংশ নেয়া ডব্লিউইএফের কাউন্সিল সদস্যদের প্রায় অর্ধেকই ভবিষ্যতে সহযোগিতার অবনতি আশঙ্কা করছেন। প্রায় অর্ধেক নির্বাহী জানিয়েছেন, শান্তি ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি তাদের ব্যবসা পরিচালনায় প্রভাব ফেলছে।

আরও